আমরা তখন নকশাল ছিলাম
অল্প বয়সে সাম্যবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। ষাটের শেষে সে আকর্ষণ, অমোঘ হয়ে উঠেছিল, সময়ের প্রভাবে। আমার মত আরো হাজারো যুবা, কিশোর সেই টানে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল। ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য তখন ভীষণ চোখে লাগতো। অল্পবয়সের হৃদয়ের সংবেদনে তা ঘা দিত প্রবল। কেন এমন হবে? তখন সুকান্ত পড়েছি, কেন বড়লোকের মোটর চাপা পড়ার জন্যই থাকবে গরীব মানুষ, তার উত্তর কিছু ছিলনা। আঠেরো হবার আগেই যেন আঠেরো আমাদের ছুঁয়ে দিল, স্পর্ধা আর দুঃসাহসেরা উঁকি দিতে থাকল। আমাদের স্বপ্নে ছিল এক বৈষম্যহীণ সমাজ গঠন। তার জন্য চাই জনযুদ্ধ, সশস্ত্র বিপ্লব, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা। উদ্দেশ্য মহৎ ছিল সন্দেহ নেই। বহু প্রাণ ও অকাতরে বিসর্জন গেছে সে লড়াইয়ে। কিন্তু ৭৫-এ মুক্তির মহাকাব্য রচনা করা যায়নি। সে লড়াইয়ের পার্শ্বফলাফল সমাজে যাই ঘটে থাকুক, মূল যুদ্ধ হারতে হয়েছে। পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এসে আজ যখন অতীতের কথা ভাবি, বুঝতে পারি বাংলা তথা ভারতবর্ষকে আমরা কত কম চিনতাম।কত কত সমস্যা আমাদের নজরের বাইরে ছিল। দুয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয় টা বোঝা যাবে। আমরা ধর্ম বা সম্প্রদায়, জাতপাত বিভাজন, নারী-পুরুষ বৈষম্য, বা ভাষা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির নিজস্বতার আকাঙক্ষা, এগুলোকে ভাবিনি। বা ভেবেছি বিপ্লব ই এসব সমস্যার এক অটোমেটিক সমাধান করে দেবে। আলাদা করে ভাবার দরকার নেই। আজ যারা সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেন, ইতিহাসের ব্যর্থতা থেকে তারা শিক্ষা নেবেন…….এর সঙ্গে যুক্ত হবে পরিবেশ, জল জমি জঙ্গল বাঁচানোর ও লড়াই। পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারনার গোড়ায় আঘাত না করে যে মানুষের পক্ষে সাস্টেনেবল কোনো বিকাশ হতে পারেনা, এমনকি অতীতের সমাজতান্ত্রিক মডেল ও যে অচল, পুঁজিবাদের ই রকমফের, এই সব ই আজ বিবেচনায় আনতে হবে। এছাড়া পথ নেই। ইতিহাস জন্মান্ধ বালক, আমার আপনার স্বপ্নের গন্তব্যে পৌছানোর কোনো দায় তার নেই। তাকে কতটা গড়ে তোলা যায় নতুন আলোকে…….সেটাই সময়ের দাবী। অনেকেই আমাকে বলেন সত্তরের দিনগুলির অভিজ্ঞতার কথা লিখতে। কিন্তু আবার মনে হয় কী হবে লিখে, আমি যে একদা নকশাল ছিলাম, তার বিজ্ঞাপন হয়ে যাবেনা তো! আমার ভাবনা ও অবস্থান এখন, সেদিনের চেয়ে অনেক পৃথক। অনেক নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে নিজের অতীত কে দেখতে পারি। এটা বয়সের অর্জন। তবু নিজের যৌবনের স্মৃতির প্রতি ভালোবাসা ও দুর্বলতা যাবার নয়। তাই মাঝে মাঝে হয়ত না লিখেও পারবো না সেসব দিনের কথা।
আমরা যারা নকশালবাড়ির শুরু ও তার বেড়ে ওঠার সময় থেকে জড়িয়ে ছিলাম, নিজেদের জীবন দিয়ে, এটা ভাবতে ভালো লাগছে ৫০ বছর পরেও তার কিছু প্রাসঙ্গিকতা আজ ও থেকে গেছে। সে প্রাসঙ্গিকতাকে আমি যেভাবে দেখি তা হল, একটি ব্যর্থ বিপ্লবের ও আত্মা বেঁচে থাকে। যেমন বেঁচে আছে সিপাহি বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ। ভবিষ্যতের সকল বিদ্রোহের মধ্যেই অতীতের বিদ্রোহের আত্মা প্রবাহিত হয়। নকশালবাড়িও থাকবে, নতুন রূপে, নতুনতর অধ্যায় রচিত হবে নতুন নামে, হয়ত বা।কোনো একটা বিদ্রোহেই সমাপ্ত হবার নয় ইতিহাসের গতি। এ এক অনন্ত চলন….. .কোনো স্বর্গরাজ্য আসবেনা জেনেই। এক বছর আগের লেখা, এই দিনে।
আমাদের কচি বয়সে রাজনীতি বলতে বোঝাতো আশু বিপ্লব। বিপ্লব, যা আমূল পালটে দেবে সমাজ কে, যারা নীচে তারা উঠে আসবে ওপরে, যারা ওপরে তারা নেমে যাবে নীচে।খুব ই রোমান্টিক ছিলো সে বিপ্লব, কিন্তু সত্য ও ছিল। সত্য বা সত্যের ধারণা ছিলো বলেই হাজার হাজার ছাত্র যুবরা, ঘর ছেড়ে, বিদ্যায়তন ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো, আর মরেও ছিলো হাজারে, জেল খেটেছিল অগুন্তি।মুর্শিদাবাদের এক সান্তাল গ্রামে আমার থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সে গ্রামের একটি তরুন ছেলে গান বেঁধেছিল, ‘ দেশ দিশম লোটুই লাগি, সান্তাল সমাজ হারাই লাগি, মাও সেতুং চারু মজুমদার উপেহ লাকানা, উনকিন গিকিন রফা রুওরকে…….. উচ্চারণে কিছু ভুল থাকলে মার্জনীয়।আজ আর সে বিপ্লব নেই।তার ইতিহাস-সঙ্গত কারণ ও রয়েছে।
যারা আজ নিজেদের নকশাল ভাবেন, তাদের চোখ কি করে আমার হবে! আমি নকশালবাড়ী পেরিয়ে গেছি বহুকাল। কিন্তু
