কাকাবাবু পর্ব ২

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

তার আগে বিগ জেনারেশনের কবিরা একদম মিল তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের বাংলাতেও রবীন্দ্রনাথ নিজেই মিল বাদ দিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন আধুনিকতা সেই দিকেই যাচ্ছে। তারও আগে মাইকেল মধুসূদন দত্ত মিল বাদ দিয়ে লিখতেন। তাঁর লেখা ছিল অমিত্রাক্ষর ছন্দে, মানে মিত্র নেই তাঁর লেখায় দুটো লাইনের শেষ শব্দগুলোয় মিত্রতা, মানে বন্ধুত্ব ছিল না। মাইকেল-এর এই মিল ছাড়া লেখার ফলে বাংলা ভাষায় অনেক ক্ষতি হয়েছিল। কারণ অনেকেই ভাবল, কবিতা লেখা সহজ হয়ে গেল। মিল ফিল নেই, তাই সেই সময় যাত্রা থিয়েটার-এ আজেবাজে কবিতা লেখা হতে শুরু করল। কারণ মাইকেল যা পারেন সবাই তো আর তা পারে না ।কিন্তু ওই যে মিলটা মাইকেল সরিয়ে দিলেন, তার ফলে বাংলাসাহিত্যে এক নতুন দরজা খুলে গেল। জানা গেল, মিল ছাড়াও কবিতা দাঁড়াতে পারে। যাঁরা ভাল কবি তাঁরা মিল ছড়াও অনেক ভাল কবিতা লিখেছেন। এর পর এমন একটা সময় এল, যখন বলা হল মিলও দরকার নেই ছন্দও দরকার নেই। আমাদের দেশে জীবনানন্দ দাস থেকে শুরু করে অনেকেই এ রকম কবিতা লিখেছেন। বিদেশি সাহিত্যে প্রোজ পোয়েম বলে অনেক নামকরা কবি লিখে গেছেন। ফরাসি সাহিত্যেও এর অনেক উদাহরণ দেখা যায়। তা হলে দেখা যাচ্ছে মিল ছাড়া একদম গদ্যের মতোও কবিতা লেখা যায়। তবে এই লেখা কিন্তু সবচেয়ে কঠিন। আমি নতুনদের বলব খবরদার গদ্য কবিতা লিখতে যেও না। কারণ কোনটা কবিতা কোনটা গদ্য এই সীমারেখা নির্ধারণ করাটা খুব শক্ত। বেশিরভাগ সময় গদ্য কবিতা লিখতে গেলে যদি খুব চর্চা না থাকে, মানে যার এই আঙ্গিক তেমন জানা নেই বা এই আঙ্গিকের অ্যানাটমিটা ঠিক মতো জানা নেই সে লিখতে গেলে তার লেখা গদ্যই হয়ে যাবে, কবিতা হবে না। তাই এই আঙ্গিকে লিখতে গেলে চর্চা চাই, চর্চা বা পড়াশুনা থাকলে তবেই সীমারেখাটা বোঝা যাবে। দেখতে একই রকম লাগলেও সীমারেখার এ পাড়ে সেই লেখা হবে গদ্য, অন্য দিকে হবে কবিতা।
এ হচ্ছে অনেকটা ফরাসি দেশের সুন্দরী কন্যাদের মতো। যাদের সম্মন্ধে কথিত আছে, তারা নাকি এক ঘন্টা ধরে মেকআপ নেয় তারপর সব মুছে ফেলে। যার ফলে তাদের দেখলে বোঝা না যায় তারা মেকআপ করেছে। এই কবিতাও খানিকটা সেই রকম। আগে ছন্দ, ব্যাকরণ সব চর্চা করতে হবে, তবেই সেই ছন্দকে বাতিল করা শিখতে পারবে। বলতে পারবে ছন্দের দরকার নেই। যেমন মেকআপ মুছে ফেলার আগে মেকআপ করতে শিখতে হবে, নইলে মুছতে গিয়ে হয় উল্টোপাল্টা হয়ে বিশ্রী অবস্থা হবে, আবার না মুছতে পারলে মেকআপ প্রকট হয়ে থাকবে। কাজেই কবিতায় শুধু ছন্দ নিয়ে লেগে থাকলে মেকআপের মতোই সেও প্রকট হয়ে থাকবে। তাই কবিতা লিখতে গেলে কিংবা অন্য কারও কবিতা পড়তে বা বুঝতে গেলেও তার লেখায় আসল মজাটা কোথায় বুঝতে
গেলেও কবিতা বা ছন্দ নিয়ে চর্চা করতে হবে। তবে এই ছন্দ বা অন্তমিলের থেকেও যেটা বেশি ইম্পরট্যান্ট সেটা হল শব্দ। বাংলা কেন, যে কোনও ভাষায় শব্দের ব্যাবহার জানা খুব জরুরি। যে কোনও ভাষায় একটা শব্দের অনেক প্রতিশব্দ আছে। যেমন আকাশ এর প্রতিশব্দ গগণ, নীলাম্বর, আরও অনেক প্রতিশব্দ ও আছে ডিকশেনারি খুঁজলে পাওয়া যাবে। এখন কবিতা লেখার সময় তো আমরা ডিকশেনারি নিয়ে বসি না, তাই কখন