যেকোনও শহরেরই গড়ে ওঠার পিছনে কোনও কারন থাকে ।এই শহরটিও তার ব্যতিক্রম নয়।নবাব জমানায় মুর্শিদাবাদ থেকে বর্ধমান যেতে গেলে বা ইংরেজ আমলে কলকাতা থেকে বিদ্রোহদমনের জন্য সাওঁতাল পরগনা , লোকালয় ছাড়িয়ে চলার পথে মানুষ এবং তার বাহনের বিশ্রামের জন্য জঙ্গল সাফ করে গড়ে উঠেছিল এক চটি ।উঁচু ডাঙ্গালের বিস্তীর্ন তৃণভূমি বাহনখাদ্য।প্রথম প্রথম পথিকের সংগেই থাকতো খাদ্যসম্ভার । লোকমুখে খবর ছড়ালো । ভাগ্যান্বেষী মানুষ জুটলো চটির চারপাশে ।
এই রাঙামাটির ভূখন্ড , শুষ্ক ,জলবিহীন , শাল, আশশেওড়া বাবলাগাছ কন্টকিত। এই স্থানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল স্থিতস্থান থেকে গন্তব্যে পৌছোনোর পথে কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য।
তাই আপনবেগে পাগলপারা জীবননদীতে বহমান অন্য জায়গার মানুষজনের থেকে এখানে বসতিকরা মানুষজন আদিতে ছিল অন্যরকম।
গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহ , দৈত্যাকার ধূলোর কালবৈশাখী, রক্তপলাশের বসন্ত ,কুয়াশা ঘেরা হেমন্ত আর দিগন্ত আকুল করা বর্ষণ এই কাঁকরভরা রাঙা মাটির ধূধূ প্রান্তরকে ভরে তুলতো বৈরাগ্যে।
উঁচুপ্রান্তরে পড়া বর্ষণধারা প্রাকৃতিক নিয়মে বয়ে যেত ঢালু পথে । নিরলস মনোযোগী ক্ষীয়মানা ছিপছিপে সেই তন্বী বারিধারা একগামী হওয়ার ফলে এতোটাই শক্তিমতী হয়ে উঠেছিল যে শক্ত কাঁকুরে রাঙামাটির বুকে চিরস্হায়ী চিহ্নিত
করে তুলেছিল তার নাতিগভীর গমনরেখা।
অমলিন স্বচ্ছ সেই জলধারা আকাশ থেকে নেমে এই পৃথিবীর ভালমন্দ বুকে সঞ্চিত করে নদীমাতা কাত্যায়ণী হয়ে স্তনপান করান নি তার সন্তানদের। তাঁর নির্দিষ্ট উত্স ও গন্তব্য সামনে রেখে অনুক্ত নির্দেশও দিয়ে যাননি জীবন পথের ।
এই বর্ষণ উত্সা জলধারার আনন্দ শুধু আপনগতিতে বয়ে চলায় । এইরকম উদ্দেশ্যহীন চলার আনন্দেই এই মৈত্রেয়র মুক্তি । এই আনন্দই তার অমৃত ।
যাতায়াতের এই চটি ঘিরে একটি দুটি করে অন্ত্যজ শ্রমজীবি পরিবার নবাব আমলে বসতি শুরু করে। তারা হিন্দু ছিল । কিন্তু যবন ও ম্লেচ্ছ সংস্পর্শের হিন্দু ছুতমার্গের ঘৃণা তাদের মুসলমান হতে বাধ্য করলো।
তারা জানতো না ধর্ম কী । দৈনন্দিন জীবনের কোনও পার্থিব চাহিদা , প্রিয়জন বা নিজের জীবন হারানোর ভয় তাদের ছিল না । তাই কোনও অদৃশ্য শক্তির কাছে নতজানু হয়ে হাতজোড় করে নিজের জন্য কিছু চাইতে শিখল না তারা।
তবুও তাদের নতুন ধর্ম গ্রহন করতে হল ।করতে হল এই কারনে নবাব বা পরবর্তী কালে ইংরেজ রাজকর্মচারীদের খাবার বা পাচক নিয়ে ছুতমার্গ না থাকলেও হিন্দু কর্মচারী রা স্বপাক বা ফলাহারেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। নিম্নবর্নের এই হিন্দুরা মুসলমান হওয়াতে দুটি ঘটনা ঘটলো । ম্লেচ্ছ এবং যবনদের খাদ্য ও পাচকের অভাব রইল না।যেহেতু তারা মূলত নিম্ন বর্ন থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল তাই তাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন না হলেও সম্পন্নদের জন্য রান্না করতে হতো বলে রন্ধনশৈলির পরিবর্তন ঘটাতে হল । আর হিন্দুরা যাতে তাদের বাহ্যিক আচার আচব়়ন আর পোষাক পরিচ্ছদ দেখে বিধর্মী বলে চিনতে পারে তাই হিন্দুদের থেকে আলাদা রকমের দাড়ি রাখা ,টুপি পরা শুরু হল । হিন্দু সাদা ধুতি পরে , মুসলমানের চেক লুঙ্গি, হিন্দু মাদুর যে দিকে পাতে ,মুসলমান তার উল্টোদিকে,হিন্দু ঘটি নিয়ে শৌচকর্ম করে তো মুসলমানকে গাড়ু নিতে হবে।একটু সমৃদ্ধি হলে হিন্দু মাটির বাসনপত্র থেকে কাঁসা পিতল ভরনে উঠলো তো মুসলমান সাদার ওপর ফুলছাপ দেওয়া নীল বর্ডারের কলাইকরা বাসনে।
প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা বহিরঙ্গের এই ভেদ কিন্তু অন্তরে কোনও বিভেদ ই সৃষ্টি করতে পারলো না । পারলো না যে তার কারন এখানে কোনও বনিক ছিল না চন্ডীর উপাসনা করার , জলাজঙ্গল ছিল না যে মনসা দেবী উঠে আসবেন, লোকালয় শশ্মান ছিল না ধর্মরাজের আরাধনার জন্য, লুঠ তরাজের জন্য কালী ভক্ত ডাকাত দলের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ছিল না কোনও ঘন জঙ্গল।
চরাচর বিস্তীর্ন রাঙা মাটির ডাঙ্গাল ,কাঁকরের ওপরে বয়ে যাওয়া ক্ষীণ কিন্তু স্বচ্ছ জলধারা,আর কন্টকাকীর্ণ বৃক্ষ শোভিত এই অঞ্চল যেন নির্মেদ সন্ন্যাসীর বাহুল্য বর্জিত আবাসভূমি।
বর্ষার জল ক্ষীণতোয়া হতে হতেও বসন্ত পর্যন্ত থেকে যেত । নির্জলা গ্রীষ্মের প্রখর তেজ ,আগুনের হল্কা নিয়ে বয়ে চলা বাতাস কিন্তু এখানকার মানুষজন কে অসহিষ্ণু করে তুলতে পারতো না । তারা জেনে ফেলেছিল মাস দুয়েক কষ্ট করে থাকতে পারলেই প্রকৃতি আবার দুহাত উজাড় করে দেবেন ।
এই উন্মুক্ত গৈরিক প্রকৃতির সংগে এসে মিশলো আজান , আল্লা সর্বশক্তিমান ,আমি সাক্ষী, তিনি ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই , আমি সাক্ষী ,মহম্মদ ই সর্বশক্তিমান আল্লার বার্তাবাহক , এসো ,প্রার্থনা কর , এসো , তোমার মঙ্গলের কাছে প্রার্থনা কর।আল্লা সর্ব শক্তিমান।
যেহেতু এই আকুল আমন্ত্রণ ছড়িয়ে পরতো দিকে দিগন্তরে গেরুয়া প্রান্তরে , আজানের ভাষা না জানার কারনে তারা মনে করতো এই চরাচর ই হয়তো তাদের উপাস্য। এ যেমন ভাবে ধরা দিচ্ছে সেই ভাবে গ্রহন করাই তাদের ধর্ম ।
পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ এ তাদের প্রাথর্না ছিল , পূর্ব আর পশ্চিম যেমন সর্বদা পরস্পর দূরে থাকে , পাপ থেকে আমাকে তেমনই সর্বদা দূরে রাখো, সাদা কাপড়ের মালিন্য যেমন ধুলে পরিষ্কার হয়ে যায় , সেই রকম আমার সমস্ত পাপ ধুয়ে আমাকে মালিন্যহীন কর , আমার সমস্ত পাপ পরিষ্কার করে দাও জল বরফ আর কুয়াশা দিয়ে ।
তারা জানতো এগারো মাস সংসারের জন্য দিয়ে একমাস সেই পরমশক্তিমানের সংগে নিজেকে যুক্ত রাখার নাম রোজা । থুতু পর্যন্ত না গিলে উপবাস করার একমাস পর বাড়িতে বকরি হালাল করার পর এক ভাগ মসজিদে দরিদ্রদের জন্য পাঠিয়ে, দ্বিতীয় ভাগ প্রতিবেশীদের দিয়ে শেষভাগটা আত্মীয় বন্ধুর সংগে ভাগ করে নেওয়ার যে মালিন্যহীন তৃপ্তি , সেটাই তাদের আনন্দ , সেই আনন্দই তাদের ধর্ম।
কী তাদের করা উচিত নয় ,সেটা তারা জানতো না, কী তাদের করা উচিত শুধু সেটুকু জেনেই তারা জেনে ফেলেছিল কী তাদের করা উচিত নয় । পুতুল পুজো তখনও শুরু না করা নিম্ন বর্নের হিন্দুদের সংগে মিলেমিশে থাকতে তাদের কোনও বাধাই ছিল না ।শিয়া সম্প্রদায়ের এই মানু়ষজনের কাছে ইমামের ভূমিকা ছিল খুব গুরুত্বপূ্র্ণ । আর ইমামের মসজিদের সামনের নিম , বট বা অশ্বথ্বগাছের নিচে যাতায়াতের পথে বসতো বাউল বা সূফি গানের আসর ।ফলে প্রকৃতি ছাড়াও গান ও তাদের অচ্ছেদ্য বাঁধনে বেঁধে রেখেছিল।
সাঁওতাল বিদ্রোহের পর ইংরেজ শাসক তার শাসন সুবিধার্থে এখানে গড়ে তুললো কারাগার , বিচারালয় । বসতি শুরু হল নানা মতির মানুষের ।আশেপাশে যে সব জেলা গড়ে উঠলো সেখানে জমি নিয়ে মারামারি খুন খারাপি লেগেই থাকলো । কিন্তু এই জেলার সাঁওতাল পরগনার ধার ঘেঁসা এই অঞ্চলটুকু সুফি ,বাউল ঘরানার কারনে বা গড়ে ওঠার ইতিহাসের কারনে অথবা এর প্রাকৃতিক বৈশিষ্টর কারনে ঝগড়াঝাঁটি ,মারামারি খুনখারাবি থেকে দূরে দোল ঝুলন দুর্গোত্সব মহরম পীর দরগা দাতাসাহেব নিয়েই থেকে গেল ।
চটি থেকে গড়ে ওঠা এই শহর থেকে মাইল ছয়েক দূরে দাতা সাহেবের সমাধি । চটি গড়ে উঠেছিল প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে , শহরের সূচনা দু শো বছর , নাগরিক বসতি স্হাপন অষ্টাদশ শতকের শেষ দুই দশকে । দাতা সাহেব ও সেই সময় ই থাকতে এলেন । খেটে খাওয়া গরীব গুর্বো মানুষদের জাত ধর্ম না দেখেই তাদের রোগ ব্যাধি দূর করতেন । অসুখ বিসুখ দায় বিপদে আনন্দে শুভকাজে পাশে থাকতেন ।তাদের ভালবাসতেন । রোগ ব্যধি দূর করার তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার জন্য তাই এতো ভালবাসা পেলেন যে তিনি নশ্বর দেহ ত্যাগ করার পরও মানুষের মনে বেঁচে থাকলেন ।
তো দশ চৈত্র এই দাতা সাহেবের দরগায় চাদর চরাতে গিয়ে বাস অ্যাক্সিডেন্টে মাস চারেকের বাচ্চাটার বাবা মা একসংগে মারা গেল । মুড়ির টিনের মতো নাড়িয়ে নাড়িয়ে মানুষ ভরা বাসটা চার দিকে মুসলিম অধ্যুষিত সেই মফস্বল থেকে ছেড়েছিল ঠিক ই কিন্তু দাতা সাহেবের কাছে তো শুধুই মুসলমানরা যায়না । আর বাসে যারা উঠেছিল তারা সক্কলে যে সেই মফস্বলের বাসিন্দা ,তাও নয়। ট্রেন নয় , ওখানে বাস ই যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। আশপাশের নানা জায়গা থেকে নানা ভাবে মানুষজন এসে এই দাতা সাহেব স্পেশাল বাসে চড়েই দাতার কবরে মনস্কামনা পূরণের চাদর চড়াতে যায়।
একপাল গরু বাঁচাতে গিয়ে বারদুয়েক পাল্টি খেয়ে বাসটা থামলো ঠিকই , তবে উল্টো হয়ে।বাসের ছাদে বসা , ছাদে ওঠার সিঁড়িতে দাঁড়ানো মানুষ জন যে যার মতো লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে নেমে পড়ল ,একটু আধটু কাটা ছেঁড়া নিয়ে । বাসের ভিতরের চিঁড়ে চ্যাপটা ভিড়ের মানুষজনেরও যে হাত , পা ভাঙা ,মাথা ফাটা ছাড়া খুব একটা বেশি কিছু হয়েছিল তাও নয়। শুধু একদম পিছনের লম্বা সিটে গাদাগাদি করে ছ জন মানুষের মধ্যে দুটো জানলার ধারে যে দুজন করে চার জন বসেছিল তারা ই মারা গেল । রক্তে ভেসে গিয়েছিল ।সেই চারজনের মাঝখানের দুজনের মধ্যে একজন ছিলেন মফস্বলের সবচেয়ে বড় মসজিদটির মৌলবি।
তা একটু কাটা ফাটা ছাড়া মৌলবি আব্দুল হাসিব সাহেবেরও খুব একটা কিছু হল না ।
কিন্তু বছর ষাটের মৌলবি সাহেব চটজলদি একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন । বুক দিয়ে সন্তানটিকে আঁকড়ে ধরে প্রাণহীন যে মা রক্তাক্ত হয়ে তাঁর পায়ের কাছে পড়ে ছিল বাস থামার পর মৌলবি সাহেব সেই বাচ্চাটিকে সযত্নে কোলে তুলে রাস্তার ধারে বসে রইলেন ,কেউ যদি খোঁজ করে সেই আশায়। লোকজন এলো , আ্যম্বুলেন্স এল , সরকারি অফিসার এলো , পুলিস এলো । দু জোড়া মৃত দম্পতির নাম ধাম কিছুই জানা গেল না ।ঘন্টাতিনেকের মধ্যে যার যার আত্মীয়স্বজন এসে কাউকে বাড়ি কাউকে হাসপাতাল নিয়ে গেল ।মৃত দম্পতি দুজনের কেউ এল না ।অথচ মৃতদের ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার এক লক্ষ করে টাকা ঘোষণা করলো।
মৌলবি সাহেব জানালেন , একটি মৃত দম্পতি তাঁর বাবার খালাতো ভাইএর নাতনি । দাতা সাহেবের কাছে বাচ্চার সূন্নত করিয়ে চাদর চাপাতে আসবে বলে পরিচয় দিয়ে চিঠি লিখেছিল । মৌলবি সাহেবের বাবা , তাঁর খালাতো ভাই , তার মেয়ে সবাই মারা গেছেন । এরা কোথায় থাকতো ,কোথা থেকে আসছিলো কিছুই তিনি জানেন না ।ক্ষতি পূরণ পেতে গেলে যে সব পরিচয় পত্র লাগে সে সব তাঁর কাছে নেই ,তাই তিনি সে সব চান না । বাচ্চাটাকে তিনি আপাতত নিজের কাছে রাখছেন ।যদি কেউ এসে প্রমান দিয়ে নিয়ে যেতে চায় ,তাহলে নিয়ে যেতে পারে ।
ছোটো থেকে মেহবুব এ গল্প অনেকবার শুনেছে ।যা পুলিশকে বলা হয়েছিল হুবহু এক ।
- তারপর দাতা সাহেবের নামে তোমার নাম রাখলাম মেহবুব । দাতা সাহেব যেমন মানুষের শরীরের আধি ব্যধি দূর করতেন , বড় হয়ে তুমিও তেমনি মানুষের মনের ব্যধি দূর করবে ।
- কী করে করবো ? ফকিরবাবার মতো ঝাড়ফুঁক করে না কিনু ডাক্তারের মতো ইন্জেকশন দিয়ে ….
- ভালবেসে , মনের ব্যধি শুধু ভালবাসায় সারে ,তুমি শুধু সবাই কে ভালবাসবে ।
মেহবুব কে নিয়ে আসার পর অনেকেই বলেছিল গরুর দুধের ব্যবস্থা করার কথা ।হাসিব সাহেব রাজি হন নি ।অসহায় বাছুরকে দিয়ে দুধ টানিয়ে তারপর সেই দুধ তাকে খেতে না দিয়ে মেহবুব কে খাওয়াতে তাঁর মন চায়নি । তিনি আশপাশের মা দের বলেছিলে তাদের বাচ্চাদের খাওয়ানোর পর মেহবুবকেও যেন তারা যারযার সময় মতো আধঘন্টা পর পর বুকের দুধ খাইয়ে যান ।
মসজিদের উঠোনে হামা টেনে , আজান শুনে , নামাজ দেখে , মাদ্রাসার পড়া শুনে শুনে মেহবুব বড় হতে লাগলো। মাদ্রাসায় দাখিল হলেও তার পড়ায় মন নেই । সে মৌলবি সাহেবের কাছে শহর গড়ে ওঠার গল্প শোনে , দাতা সাহেবের গল্প শোনে , হজরত মহম্মদের এন্তেকালের পর শিয়া সুন্নির ভাগ হও়য়া শোনে । কারবালার প্রান্তরে একফোঁটা জলও খেতে না দিয়ে হজরত মহম্মদের দুই নাতি হাসান , হোসেন কে মেরে ফেলার গল্প শোনে ।
শহরের ঠিক মাঝখানে মসজিদ ।চৌরাস্তার মোড়ে । তার একটা রাস্তা টিকে পাড়া ,রুটি পাড়া পেরিয়ে দুভাগ হয়ে এক ভাগ গিয়ে শেষ হয়েছে কাঁটাবনিতে ।সেখানে এক বিশাল পুকুরের চারপাশে বাসকরে হাড়ি বাউড়ি ডোম মুচি আর নিম্নবিত্তের মুসলমানরা ।সেখানে ঘরে ঘরে হাঁস,মুরগি ,শুয়োর ছাগল পোষা হয় ।আবার গরুও কিনে আনা হয় কাটার জন্য । ভোরের আলো ফোটার আগেই গরু জবাই করে চিনির বস্তা ঢাকা দিয়ে সেই মাংস পৌছে যায় টিকে পাড়ার দোকানগুলোয় ।শহর ঘিরে থাকা মুসলমান প্রধান গ্রাম গুলোতে গোস্ত যায় এখান থেকে । টিকে পাড়া ঢোকার আগে যেখানে রুটি পাড়া শেষ হচ্ছে সেখানে রান্নার গন্ধে ম ম করা বক্সি মিয়াঁর হোটেল।
আর অন্য রাস্তাটা মাদ্রাসা রোড ধরে বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে ডান দিকে বিশাল খেলার মাঠ আর বাঁ দিকে কবরখানা আর পীরতলাকে পাশে রেখে বেরিয়ে গেছে শহরের বাইরে। গুলঞ্চ গাছে ছাওয়া এই কবর খানা আর পীরের দরগা মেহবুবের বড় প্রিয় । মেহবুবের আব্বু আর মেহবুবের আম্মি লেখা পাশাপাশি দুটো কবর ।
একহাত উচুঁ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা জায়গার একপাশে সবুজ কাঠের গেট।মাঝখানে বটবৃক্ষের ছায়ায় শুয়ে আছেন পীরবাবা ।প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় কাতর কেউ কবে কতো দিন আগে এক মরমী মানুষের কাছে কেঁদে পড়েছিল , তথাগত বুদ্ধের মতো তিনি তাকে হয়তো শোক ভোলাতে পারেন নি ,কিন্তু সহ্য করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন , তারপর তিনি চলে যাওয়ার পরেও জাতি ধর্ম নি্র্বিশেষে মানুষ তার কাছে এসে পাঁচটা বাতাসা রেখে ,পাঁচটা ধুপ জ্বালিয়ে মনস্কামনা পূরনের আশায় বটবৃক্ষের ঝুরিতে সুতো বাঁধে । কামনা পূরণ হবেই এই বিশ্বাস কিছুদিন অন্তত তাদের বেঁচে থাকা সহনীয় করে তোলে ।
আব্বু আম্মির কবরে ফুল চড়িয়ে ,মেহবুব পীর সাহেবের দরগায় এসে বসে ভাবে , আব্বু আম্মি মাটিতে মিশে গেছে , সেই মাটি থেকে এই বটগাছ উঠে আমায় আব্বু হয়ে ছায়া দিচ্ছে , আম্মি হয়ে হাওয়া দিচ্ছে ।
মাদ্রাসা রোড ,টিকে পাড়া রুটি পাড়া মুসলমান পাড়া জুড়ে মধ্যবিত্ত মুসলমানের বাস । আর উচ্চবিত্তরা সমস্ত পাড়ায় ছড়িয়ে আছেন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়।
- হাসান হোসেন কবে মারা গেছে , এখনও কেন লোকে বুক চাপড়ে ওদের জন্য শোক করে ?
- কারন ওদের অল্প বয়সে এক ফোঁটা জলও মুখে না দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল ।সেই কষ্ট মনে রেখে আমরা মানুষ কে জানাই, এই রকম করতে নেই ।
- সবাই তো মরে যাবে একদিন।ওরাও মরে গেছে।আমার আব্বু আম্মিও মরে গেছে। তুমি বলো আল্লাতালার মর্জি। তাই তা কবুল ।তাহলে ওরা হাসান হোসেনের জন্য কাঁদে কেন ?
যে হাত প্রতিদিন পবিত্র কোরাণ স্পর্শ করে , যে মুখ হাদিসের ব্যাখ্যা শোনায় , সেই হাত দিয়ে মৌলবি সাহেব মেহবুবকে কাছে টেনে নেন ,সেই মুখ দিয়ে মেহবুবের কপালে চুমু খেয়ে বলেন ,গাছে ফুল দেখেছো চাঁদ আমার ? আর ফল ?কুঁড়ি হয় , ফোটে ,বড় হয় ,ঝরে যায়। মানুষও সেই রকম । সেই কুঁড়ি ফোটার আগেই ছিঁড়ে ফেলা গূনাহ্ , মানুষকেও তেমনি নিজে হাতে মেরে ফেলা গূনাহ্ ।শেষ বিচারে আল্লা সে গূনাহ্ মাফ করেন না । তখন ভালো কাজে আল্লার বিচারে বেহস্ত নসিব হয়, খারাপ কাজে দোজখ । - কী করে বুঝব বুঝবো কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ কাজ?
- লোভ কোরো না , রাগ কোরো না ,কারোর মনে কষ্ট দিও না ,শরীরে আঘাত কোরো না , বিশ্বাস রেখো আল্লাতালা আছেন ।ভরসা রেখো তাঁর ওপর, তাহলেই ভাল কাজ করা হবে ।আর ভাল কাজ করলেই বেহস্তে গিয়ে তোমার শরীর মনে কষ্ট থাকবে না ।তোমার যেরকম ভাবে থাকতে ইচ্ছে করবে আল্লাতালা তার থেকেও ভাল ভাবে তোমাকে রাখবেন ।
- তাহলে আমার আব্বু আম্মি মরে গেল কেন ?
- আল্লা তোমাকে খুব ভালবাসেন বলে তাঁদেরকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখলেন। আল্লা ভাবলেন মেহবুবের আম্মা আব্বুকে নিজের কাছে রেখে তার বদলে মেহবুবকে আমি অনেক মা দেব , অনেক বাবা দেব ,অনেক নানা , খালা ,চাচা ,চাচি দেব ,যাদের মেহবুব কোনওদিন কষ্ট দেবে না , সারাজীবন দেখভাল করবে। অনেক বড় ভাই ,বড় বোন দেবো,ছোটো ভাই ,ছোটো বোন দেবো যাদের মেহবুব ভালবাসবে …..
- নিয়ে এই রকম করতে করতে আমি দাতা সাহেব হয়ে যাব ,নাকি পীরবাবা ?
- চাঁদ আমার , তুমি মেহবুবই থাকবে । জগতের সবার মেহবুব…..।এখন সংসারে কারোর মেহবুব নেই ।তুমি তাই সবার মেহবুব হবে ।
এই মফসসলের গাঘেঁসে রয়েছে সীমান্ত লাগোয়া অন্য জেলা ।কৃষিনির্ভর এই জেলায় জমি নিয়ে খুনোখুনি মারামারি নিত্যকর্ম ।তো সেই গ্রামে বাইকে করে শাল চাদর চুড়িদার কার্পেট বিক্রি করতে আসা জামালের প্রেমে পড়লো। জামালের অনেক গুণ ; রেডিও ,টিভি,মোবাইল ঘড়ি সারাতে পারে , সব রকম গাড়ি চালাতে পারে ।আজান দিতে পারে ।আর পারে জাদু ভরা কথা বলতে।
মৌলবি সাহেব এক্রামুলের পঞ্চমতম কনিষ্ঠা কন্যা রশিদা।বিয়ের কথা বলার সময় জানা গেল জালালের হাতে অনেক কাঁচা টাকা । সে নাকি বাংলাদেশের ।তার মা বাবা নেই।তাই বিয়ের পর রশিদাকে নিয়ে তার এখানে থাকতেও কোনও আপত্তি নেই। মৌলবি সাহেবের ভিটের জমি পাঁচ ভাগ করে তার একভাগ রশিদাকে দিলে তার ওপর ইঁটের গাঁথনি করে তারা থাকতে পারে।আর হাতে টাকা থাকলে এখানে রেশন কার্ড ভোটার কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে কতোক্ষণ !মহিলা পঞ্চায়েত প্রধানের কাজ শুধু সই করে সার্টিফিকেট দেওয়া ।কতোটা কী নিয়ে কাকে কী দিতে হবে সে সব ঠিক করার দায়িত্ব তার স্বামীর।তাই দশ হাজার টাকার বিনিময়ে অঞ্জাত কুলশীল শেখ জামাল এই দেশের নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র পেয়ে গেল ।
বিয়ের পর সে মাসে এক দুবারের বেশি জামা কাপড় বিক্রি করতে বেরোয় না ।তাতে যে টাকা আসে রশিদা অতো টাকা কোনও দিন চোখেও দেখে নি ।জামাল কিছু দিনের মধ্যেই গ্রামের সবার কাছে খুব প্রিয় হয়ে উঠলো কারন যার যখন দু পাঁচশো হাজার টাকার দরকার হয় সূদ ছাড়াই জামালের কাছ থেকে সে টাকা ধার পাওয়ার যায় ।একটাকা দুটাকা করে শোধ দিলেও সে হাসি মুখে থাকে ।
এইভাবে একজন মানুষ জাল পাঁচশো টাকায় ধীরে ধীরে একটা একটা করে গ্রাম ভরে দিতে লাগলো।
দশ থেকে পনেরো বছরের ছেলেদের সংগেও জামালের খুব ভাব ।তাদের সংগে সে মাঝে মাঝেই ফিস্ট করে , ফুটবল , হা ডুডু ,ক্রিকেট খেলে , মোবাইলে গেম শেখায়,বাজি তুবড়ি তৈরি করতে শেখায় আর নজর রাখে কার মনে হিংসা বিদ্বেষ বেশি , কার শরীরে রাগ বেশি ,কার সংগে বাড়ির খিটিমিটি লেগেই আছে ,কার সাহস বেশি ,কে ডাকাবুকো ,কে যন্ত্রপাতির খুঁটিনাটি তাড়াতাড়ি শিখে নিতে পারে অথবা কে বেশ ধর্মপ্রাণ । খেলা ধুলো আর মাঝে মাঝে রান্না করে খাওয়ার দৌলতে আশপাশের গ্রামের ছেলেদের সংগেও তার জান পহচান বেড়েছে ।
জামাল তাদের মোবাইলের মুভিতে বিদেশ দেখিয়ে বলে কাশ্মীর এর থেকেও সুন্দর জায়গা । সেখানকার ছেলেরা রাজপুত্রের মতো দেখতে আর মেয়েরা সিনেমার হিরোইনের মতো ।পুলিশ মিলিটারির অত্যাচারে ওখানকার ছেলেরা দেশ ছাড়া ,তাই সেখানকার আপেলক্ষেতে কাজ করার ছেলে পাওয়ার যায় না ।কিন্তু কেউ যদি একবার ওখানে গিয়ে পড়তে পারে তো কেল্লা ফতে।মন দিয়ে নিজের মতো করে কাজ করা ছেলেদের সংগে তখন জমির মালিক নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়ে তাকে সেই আপেল ক্ষেতটা দিয়ে দ্যায় ।আর পুলিশ মিলিটারি ওখানকার ছেলেদের ওপর অত্যাচার করলেও যারা অন্য জায়গা থেকে ওখানে যায় তাদের কিছু বলে না ,কারন পুলিশ মিলিটারিরাও তো পেটের দায়ে অন্য জায়গা থেকেই সেখানে গিয়ে আছে ।
জামাল তো কাশ্মীরেই যেত কিন্তু রশিদাকে ভালবেসে ফেলেছে বলে এখানেই থেকে গেল ।
-তুমি যদি যাওনি তো এতসব জানলে কীকরে ?
-জামা কাপড় বিক্রি করতে গিয়ে পাশের জেলা সদরের ফলওয়ালা ফয়জলের কাছ থেকে । ওতো কাশ্মীরের আপেল ক্ষেতে কাজ করতে গিয়েছিল । তারপর মালিকের মেয়ে কে বিয়ে করে এখন বিশাল এক ফল বাগিচার মালিক ।বছরে একবার একবার এদিকে আসে ব্যবসার পয়সা আদায় করতে । আমিও চলে যেতাম ,কিন্তু তার আগেই রশিদার সংগে দেখা হয়ে গেল ।
- আমরা যদি আপেল ক্ষেতে কাজ করতে যাই , তো কী করে যাব ?
- আমি তো বলতে পারব না , ফয়জল জানে । দেখি ও আবার কবে আসে … তবে এ সব কথা পাঁচ কান না হওয়াই ভালো।অন্য কে আবার এ সব শুনে তক্কে তক্কে থেকে আগেই যোগাযোগ করে নেবে , তখন আবার কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে কে জানে …
অনেক সময় এদের বাবা মা ও আসে জামালের কাছে , ওতো কতো জায়গায় ঘোরে , যদি ওদের কোনও কাজের ব্যবস্হা করে দিতে পারে ।
জামাল কিন্তু কিন্তু করে জানায় , কাজ আছে , কিন্তু বড়দের জন্য নয় । বাচ্চা দের জন্য ।পয়সা আছে , কিন্তু কাজটা সুবিধার নয় । বর্ধমানের ওই দিকে কোথায় যেন বাজির কারখানা আছে ,সেখানে অনেক বাচ্চা লাগে কাজ করার জন্য ।
সেই গরিব অসহায় মা বাবা বিপদ বোঝেনা , শুধু বোঝে বাজি তে মশলা ভরা ,এ আর এমন কী কঠিন কাজ । ছেলে আমার দুবেলা পেট ভরে খেতে পাবে। যা টাকা পাঠাবে তাতে সামনের বছর বর্ষার আগে ঘরটা ছাইতে পারবো ।আর কী চাই ।
# আশপাশের গ্রামের ছেলেদের সংগে ফুটবল ম্যাচ করার পর জামাল জানালো এবার ম্যাচ পাশের জেলার সদর শহরের সংগে হবে । ম্যাচ মানে আর কিছুই নয় , ওই জায়গার কিছু ছেলে জোগাড় করে তাদের সংগে একটা দিন দেখে ফুটবল খেলা আর তারপর একসংগে রান্না করে মাংস ভাত খাওয়া । জেলা সদরে কারোর চেনা জানা থাকলে সে যদি সেখানে গিয়ে ম্যাচের ব্যবস্হা করতে পারে …..
জয়নালের ফুফাতো দিদির বিয়ে হয়েছে পাশের জেলার সদরে ।বরের বাসস্ট্যান্ডে দরজির দোকান । এইদিকের খেটে খাওয়া মানুষজনের সাধারনত এতোদূরে বিয়ে হয় না ।জয়নালের ফুফির হয়েছিল কারন তার আব্বা রাজমিস্ত্রির কাজ করতে এই দিকে যাতায়াত করার সময় বিয়ের যোগাযোগ হয়েছিল ।শাদি মরা লোকলৌকিকতায় যাতায়াত লেগেইছিল । তাই জয়নালের তাদের বাড়ি যেতে কোনও অসুবিধা হল না।
পাশের জেলার সদরে এই ম্যাচটা হওয়া খুব দরকার জামালের । খবর এসেছে ওই সদরের বড় মসজিদের মৌলবির এক বাপ মা মরা পুষ্যি ছিল। ছিল ,কারন মৌলবির মাস তিনেক হল এন্তেকাল হয়েছে ।বছর তেরোর ছোঁড়াটা মসজিদ আর পীরদরগা ছাড়া আর কোথাও যায় না ,মানে নিশ্চয়ই ধর্মভীরু , আবার আধপাগলাও বটে ,কারন গাছ পালা আকাশ পুকুর মাঠ ঘাটের দিকে একমনে তাকিয়ে থাকে । ওকে তুলতে পারলেই জামাল বছর তিনেক নিশ্চিন্ত । জাল নোট ছড়ানো আর কখনও কাউকে থাকতে দেওয়া ছাড়া আর কোনও বড় কাজ ওকে করতে হবে না ।যাতে কেউ সন্দেহ না করতে পারে সেই জন্য ।
ম্যাচ টা করে ফেলতে পারলে মসজিদ বা পিরতলা থেকে ওকে তোলা টা জামালের বাঁহাতের খেল ।
চুয়াত্তর বছরের মৌলবি সাহেব এন্তেকালের ঠিক আগের মুহূর্তেও বোধহয় ভাবেন নি যে তিনি চলে যাচ্ছেন ।ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক । মার্বেল পাথরের মসজিদের মার্বেল পাথরে বাঁধানো বিশাল চত্বরে নমাজ অদার জায়গা ।সারাক্ষন খুলে রাখা দরজার দুপাশে ওজু করার জন্য সার সার জলের কল ।আর তার দু কোনে দুটি নিম গাছ ।মসজিদ বাঁধানোর সময় তাতে হাত দেওয়া হয় নি ।তারই গুঁড়ি ঘিরে উঁচু বাঁধানো জায়গায় শুয়ে ঘুমোনোর আগে মেহবুব কে বলা মৌলবি আব্দুল হাসিব সাহেবের শেষ কথা ছিল ,এই যে দেখো , এত গরম ,আল্লা তালা কিন্তু আমাদের কষ্ট না হওয়ার জন্য গাছের হাওয়া দিচ্ছেন । তিনি মেহেরবান । এবার আমি যদি তাঁর দান কবুল না করে ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে থেকে তাঁর মেহেরবানি বুঝতে না পারি তো শেষ বিচারে তার কৈফিয়ত আমাকেই দিতে হবে ।
মেহবুবের থাকা খাওয়ার কোনও সমস্যা হল না । মসজিদ পরিষ্কার রাখা ,লোকজন এলে তারা টুকটাক যা জানতে চায় তার উত্তর দেওয়া ,যে সব কাজ মেহবুব ছোটোথেকে করতো তাও সে একই ভাবে করতে লাগল । তার মনেই হল না মৌলবি সাহেব নেই ।তার মনে হল যেমন আব্বু ,আম্মি মাটি থেকে গাছ হয়ে বাতাস হয়ে তার পাশে ছিল তেমনই মৌলবি সাহেব ও তাই থাকবেন ।শেষ বিচারে তাঁরা বেহশ্তে গেছেন ।সেখানে মনোমতো থাকতে পারছেন তাঁরা । সবার ভাল করে , সবাইকে ভাল রেখে । গাছ হয়ে বাতাস দিয়ে , ছায়া দিয়ে ,মাটিকে শক্ত করে ধরে রেখে ।মাদ্রাসার ভূগোল বই এ গাছ বৃষ্টি বাতাস জোয়ার ভাঁটা কী করে হয় জেনে তার আরও বেশি বিশ্বাস হয়েছে সব আল্লা মেহেরবান আড়াল থেকে করছেন ।যেমন এখন সে মৌলবি সাহেবকে চোখে দেখতে না পারলেও তাঁর তৈরি করা ব্যবস্থায় সব চলছে ।
ম্যাচের জায়গা ঠিক হল ডি এস সি গ্রাউন্ডে । বাস রাস্তা পেরিয়ে তার ঠিক পাশেই কবর খানা আর পিরতলা ।তো ম্যাচ জেতার জন্য পিরের দরগায় বাতাসা চড়াতে গিয়ে মেহবুবের সংগে জামালের দেখা তো হওয়ার ই ছিল । কারন সময়ের সেই হিসেবটা জামালের মাথায়় ছকা ছিল ।আর তারপর ধাত বুঝে কথা বলে মানুষজনকে নিজের মতে আনার শিক্ষাই তো তাকে এতোদিন পাখিপড়া করে শেখানো হয়েছে ।
যে কারবালার প্রান্তরে হাসান হোসেন একটু গাছের ছায়া না পেয়ে , তেষ্টায় এক ফোঁটা জল না পেয়ে মারা গিয়েছিল ,যার মৃত্যু তে এখনও লোকে বুক চাপড়ে কাঁদে , মেহবুবের খুব ইচ্ছা একবার সেখানে যাওয়ার , জায়গাটা দেখার …..
জামাল চিন্তান্বিত ভংগিতে জানিয়েছিল, দেখি আমি কিছু করতে পারি কিনা ,তুমি ভাইজান , এখন কাউকে কিছু বোলো না , সবাই তোমাকে ঠাট্টা করবে । তুমি তৈরি থেকো ,আমি যদি কোনও ব্যবস্হা করতে পারি ,তোমাকে জানাবো ,
- যাওয়ার অনেক আগে জানিও , মসজিদ পরিষ্কার করা , পীরবাবার থান পরিষ্কার করার দায়িত্ব তো কাউকে দিতে হবে আমি না আসা পর্যন্ত ….
মৌলবি সাহেবের মতো করে বললো মেহবুব ।
দিন পনেরোর মধ্যেই সব ব্যবস্হা করে ফেললো জামাল । ওর দায়িত্ব সব কজনকে এক সংগে বা এক এক করে আব্বাসের হাতে তুলে দেওয়া ।ব্যস ।
খান ছয়েক বাচ্চা আছে যাদের বাবা মা স্বইচ্ছায় পাঠাচ্ছে “ বাজি “ তৈরির কারখানায় কাজ করতে । জামাল তাদের দু হাজার টাকা করে ধার দিল মোবাইল কেনার জন্য । মাইনে পেলে কিস্তি তে টাকা শোধ করে দেবে ।ওরা পৌঁছে আব্বু আম্মি কে ফোন করে জানিয়ে দেবে – কোথায় থাকছে ,কতো পাবে এই সব ।
- তোমরা ওদের সংগে গিয়ে দেখে আসতে পার , কিন্তু নিজের খরচে যেতে হবে , আমার হাতেও আর টাকা নেই যে তোমাদের ধার দেব …. আসলে ওদের কোন কারখানায় দেবে আমি ঠিক জানি না । আমার তো সে রকম জানা শোনা নেই , পাশের জেলা সদরে বন্ধুর ফলের দোকানে বসেছিলাম তখন একজন বলেছিল ,কারখানায় লোক লাগবে ,তো আমি ফোন নম্বর নিয়ে রাখলাম ,যদি কারোর উপকারে লাগে তাই…..
কাশ্মীরের আপেল ক্ষেতে কাজ করতে গেলে বাড়িতে কিছু না বলে যেতে হবে , যারা শক্ত সমর্থ হালুচালু তাদের জন্য আপেল ক্ষেত ।তাই এখানে যাচ্ছি , ওখানে যাচ্ছি বলে বা কোথায় যাচ্ছি কাউকে কিছু না বলেই তারা বাড়ি ছাড়ল ।সেও সেই পাশের জেলার সদরে যাওয়া । তবে যে দুপুরে বাজির কারখানায় কাজ করতে নিয়ে যাওয়া হল তার পরের দিন রাত থাকতে থাকতে , এক এক জন করে ,আলাদা আলাদা ।
সেদিন ও সন্ধ্যা বেলায় পীর বাবার থানে মোমবাতি জ্বেলে মেহবুব বসে বসে ভাবছিল , জামাল ভাইজানের সংগে কারবালায় গিয়ে সে কী কী গাছ লাগাবে , মরূভুমিতে কাঁটা আর খেজুর গাছ ছাড়া আর কোনও গাছ হয় না । আচ্ছা ,যদি মাটি নিয়ে যাওয়া যায়…. কারবালার ওই প্রান্তর থেকে কতদূরে জল পাওয়া যায় ? সেখান থেকে জল বয়ে নিয়ে আসা যায় না কি ? যদি সেখানে গাছ লাগানো যায় , জল এনে রাখা যায় তাহলে যারা সেখানে যাবে তাদের কোনও কষ্ট হবে না …..
- মেহবুব , তাড়াতাড়ি ,
ফল ভর্তি একটা ছোটো হাতির ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে জামাল দ্রুত পায়ে নেমে এল ।
-এখন যাব ? জামা কাপড় , জিনিসপত্র , গাছ বীজ …. - ও সব আমি নিয়ে এসেছি , এই দেখো , হাতের ব্যাগটা নাড়ালো সে।
- কিন্তু সবাইকে বলে যাবো না? কোথায় যাচ্ছি ,কবে আসবো…….
জামাল থমকালো , হ্যাঁ ,হ্যাঁ ,সেতো বলবেই , যারা হজে যায় দেখো না তাদের কতোদিন আগে থেকে কতো কিছু করতে হয় , এটাও সেই রকম ।তুমি কদিনের জন্য গিয়ে টিকিট ফিকিট কেটে ফিরে আসবে । তারপর আবার যখন যাবে তখন তো সবাইকে বলেই যাবে …. চল ,চল ,চল , শক্ত করে মেহবুবের হাতটা ধরে প্রায় হিড়হিড় করে ড্রাইভার আর নিজের মাঝখানে বসালো সে । গাড়ি ছুটলো দ্রুতগতিতে । সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে লাগল ধীরে ধীরে ।
দোতলা ঘরটার জানলাগুলো সব পেরেক দিয়ে বন্ধ করা ।ঘর জোড়া সতরঞ্চি ,আর একটা বড় টিভি ।সেখানে আগে থেকে ব্রেন ওয়াশ করা বছর চোদ্দ ষোলোর জনা দশেক বাচ্চার সংগে মেহবুব আর চারজনকে ঢোকানো হল ।টিভি তে সারাক্ষণ দেখানো হচ্ছে বোমা ফেলে বা গুলি করে ঘর বাড়ি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। মানুষজন ,ফুটফুটে বাচ্চাদের মেরে ফেলা হচ্ছে ।
- এগুলো সব কাফের রা করছে ।যারা এগুলো করছে আমাদের ও এইরকম করে তাদের মেরে ফেলতে হবে । তার আগে সবাইকে আল্লার নামে , ইসলামের নামে জড়ো করতে হবে ।আল্লা সেই নির্দেশই দিয়েছেন । আমাদের কাজ হচ্ছে সবাইকে আল্লার মর্জি বোঝানো । আল্লার মর্জি হচ্ছে কাফেররা যেভাবে আমাদের মারছে আমাদের ও কাজ হচ্ছে সেই ভাবে কাফের নিকেশ করা ।
টিভি তে দেখানো সেই মৃত্যু ঘরের সবাই কে ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ করে তুলছিল ।প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তারা ছটফট করছিল ।
শুধু মেহবুবের খুব কষ্ট হচ্ছিল । তার হাসান হোসেনের কথা মনে পড়ছিল । সেই দুজন তারতাজা যুবকের অকালমৃত্যুর প্রবহমান শোক তাকে ব্যথিত করে তুলছিল ।
#
যে মাটি চিরটা কাল পথশ্রমে ক্লান্ত পথিকদের পা বুকে নিয়ে তাদের শ্রান্তি দূর করেছে – সেই মাটির স্পর্শের জন্য মেহবুব ব্যাকুল হয়ে উঠলো ।
যে গাছ যাত্রা পথে ক্লান্ত পথিকদের শ্রান্তি দূর করার জন্য তাদের ছায়া দিয়েছে , বাতাস করেছে – সেই গাছের জন্য মেহবুব ব্যাকুল হয়ে উঠলো ।
শুষ্ক জল বিহীন শাল আশশেওড়া বাবলা গাছ কন্টকিত সেই রাঙা মাটির ভূখন্ডের জন্য মেহবুব ব্যাকুল হয়ে উঠলো ।
স্টেশন থেকে যে রাস্তা সিধে বাসস্ট্যান্ড মাদ্রাসা রোড ধরে বক্সি মিয়ার গোস্তের গন্ধে ম ম করা হোটেলকে ডান পাশে রেখে বাজারে গিয়ে মিশেছে ,সেই রাস্তার জন্য মেহবুবের মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো ।
দুর্গা , কালী ,সরস্বতী পুজোর ভাসানের সময় রাস্তার দুধারে যত মানুষ দাড়িয়ে প্রতিমা দেখে , মহরমের সময় তাজিয়া দেখে – সেই সব মানুষের জন্য মেহবুবের মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো ।
সবার সব মনোকামনা পূর্ণ হবে , সব ভাল হবে – এই বিশ্বাস দেওয়ার জন্য যে পীরবাবার থান – সেই থানের জন্য মেহবুবের মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো ।
কাঁটাবনির সেই পুকুর ,যার চারদিক ঘিরে বাস করা মানুষরা গরু ছাগল শুয়োর হাঁস মুরগি পালন করে কেটে বিক্রি করার জন্য – সেই পুকুর আর তার চারপাশে বাস করা মানুষদের দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো ।
শেষ রাতে বাথরুম যাওয়ার ভঙ্গিতে উঠে মেহবুব ধীরে ধীরে খিল খুলে সদর দরজার আড়়ালে একটা অন্ধকার জায়গা দেখে দাঁড়ালো ।গত পনেরো দিনে সে খেয়াল করেছে দু তিন দিন অন্তর অন্তর ঠিক এই সময়ে একজন খালি হাতে সদর দরজা খুলে বেরিয়ে ডানদিকে গলিতে ঢুকে মিনিট খানেকের মধ্যেই একটা থলি হাতে ঢুকে আবার দরজা লাগিয়ে দেয় । লোকটা বেরিয়ে গলিতে ঢোকার সংগে সংগে শান্ত ভঙ্গিতে ধীর পায়ে বেড়িয়ে মেহবুব বাঁদিকের গলিতে ঢুকে দ্রুতগতিতে হাঁটতে লাগল ।এই জায়গা কোথায় মেহবুব জানে না । এই মাটি ,এই রাস্তা , এই রাস্তার ধারের গাছ মেহবুবের চেনা নয় ।
গলায় কালো সুতো দিয়ে বাঁধা পীরবাবার কবচটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে সে ভাবলো যে মাটিতে আব্বু আম্মি মৌলবী সাহেব শুয়ে আছেন , দাতা সাহেব পীর বাবা শুয়ে আছেন ,সেই মাটি থেকে জল নিয়ে গাছ হয়ে আব্বু ,আম্মি ,মৌলবী সাহেব ,দাতা সাহেব ছায়া দেন ,বাতাস দেন , সেই মাটি এনে এখানে ছড়িয়ে দিতে হবে । সেই গাছ এনে এখানে লাগাতে হবে ।
আর প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার দূরে উথাল পাথার হাওয়ায় গাছ গুলো তাদের সারা শরীর ভরা আকুতি নিয়ে পাতার হাওয়ায় হাওয়ায় খবর পাঠাতে লাগলো , আমার মেহবুব কে , আমাদের মেহবুবকে পথ দেখাও ।
#
মেহবুব জানে কোথায় যেতে হবে ।সে দেখলো রাত শেষের মায়াময় নীলাভ আকাশ কালো মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ।জোড়ালো হাওয়ায় পথ চলা দায় । সে রাজপথে উঠলো ।ওর মনে হল যেদিক থেকে বাতাস বইছে ওকে সেই দিকে যেতে হবে ।
প্রায় দেড়শো বছর আগে এক যুবক মেহবুব এসেছিলেন এইভাবে ।মানুষের শরীরের আধিব্যধি দুর করতে ….
আজ এক বালক চলতে লাগলো সেই একই দিকে ।তার দু চোখ ভরা জল ।আর কোনও মানুষ যেন হাসান হোসেনের মতো এক ফোঁটা জলও না পেয়ে অকালে না মারা যায় ।বছরের পর বছর শোকের এই উত্তরাধিকার যেন কোনও মানুষ কে বহন না করতে হয় ……
নি:সংগ মেহবুব একাকী পথ চলিতে লাগিল ।
